ইউরোপ ::
সরকার গঠন নিয়ে কনজারভেটিভদের সঙ্গে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির (ডিইউপি) আলোচনা এখনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতায় রূপ নেয়নি। দুই পক্ষ চূড়ান্ত সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছতে পারছে কি না, তা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য আসছে।
ফলে প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে ভোটের বাজিতে হারের পর ডিইউপিকে নিয়ে নতুন সরকার গঠনের যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাতে অনিশ্চয়তার মেঘ এখনো কাটেনি।
অন্যদিকে লেবার নেতা জেরেমি করবিন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, টেরেসা মে ব্যর্থ হলে তিনি সরকার গঠনে প্রস্তুত রয়েছেন। শিগগিরই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।
গত শনিবার সন্ধ্যায় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, নীতিগতভাবে একটি চুক্তির বিষয়ে তারা দুই পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছেছে। কিন্তু রাতেই ডিইউপির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, এখনো সমঝোতা চূড়ান্ত হয়নি। তবে আলোচনা চলছে, যা ইতিবাচক। এরপর ডাউনিং স্ট্রিটও তাদের আগের বিবৃতি থেকে সরে এসে নতুন বিবৃতিতে জানায়, যখন সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে তখন দুই দলই এর বিস্তারিত সামনে নিয়ে আসবে।
গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর তুমুল চাপের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও কনজারভেটিভ পার্টির নেতা টেরেসা মে। সরকার গঠনের জন্য তাঁর ডিইউপির সমর্থন প্রয়োজন। নির্বাচনে ডিইউপি পেয়েছে ১০টি আসন। সরকার গঠনের জন্য কনজারভেটিভদের নিজেদের আসনের সঙ্গে আরো আটটি আসন প্রয়োজন। এ জন্য ডিইউপির সঙ্গে সমর্থন চূড়ান্ত করতে দফায় দফায় বৈঠক চলছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আগামীকাল মঙ্গলবার ডিইউপি নেতা আর্লেন ফস্টারের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন টেরেসা মে। এর আগে আজ সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে ডিইউপির সঙ্গে কনজারভেটিভদের সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
গত শুক্রবার নির্বাচনের ফলাফল জানার পরপরই টেরেসা মে ডিইউপির সমর্থন নিয়ে নতুন সরকার গঠনের ঘোষণা দিলেও সমঝোতা চূড়ান্ত করার জন্য এখন তাঁর হাতে সময় খুব কম। আগামী ১৯ জুন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অধিবেশন বসার আগেই তাঁকে ডিইউপির সঙ্গে সমঝোতা চূড়ান্ত করতে হবে। ওই দিনই আবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়া (ব্রেক্সিট) বিষয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
দলের ভেতরে ও বাইরে টেরেসা মের সমালোচনা পিছু ছাড়ছে না। ব্যর্থ নির্বাচনী প্রচারণায় ওয়েস্টমিনস্টারে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর টোরিদের সমালোচনার মুখেই টেরেসা মের দুজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা নিক টিমথি ও ফিওনা হিল পদত্যাগ করেছেন।
কনজারভেটিভ দলীয় সাবেক অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবর্ন প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মের সরকার গঠনের চেষ্টাকে ‘মৃত নারীর হাঁটা’র সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, বিদায় ঘণ্টা আসন্ন জেনেও তিনি কত দিন টিকে থাকেন সেটিই এখন দেখার বিষয়।
কনজারভেটিভ দলীয় সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নিকি মর্গান আভাস দিয়েছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই টেরেসা মেকে নিজ দলের মধ্যেই নেতৃত্ব নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। আজ-কালকের মধ্যেই কয়েকজন এমপি বৈঠকে বসবেন। কনজারভেটিভ দলীয় এমপি আনা সোবরি বলেছেন, টেরেসা মে কিভাবে দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকবেন তা তিনি বুঝতে পারছেন না।
এরই মধ্যে লেবার নেতা জেরেমি করবিন বলেছেন, তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। টেরেসা মের সম্ভাব্য সংখ্যালঘু সরকারের পতন ঘটিয়ে এ বছরের শেষে বা আগামী বছরের শুরুতে নতুন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ১০ দিনে টেরেসা মেকে সাতটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এগুলো হলো যুক্তরাজ্যের জন্য লাভজনক ব্রেক্সিট আলোচনা, ডিইউপির সঙ্গে সমঝোতা, মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন, তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে টোরিদের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য দূরীকরণ, নতুন উপদেষ্টা নিয়োগ, আগামী ১৯ জুন ওয়েস্টমিনস্টারে রানির বক্তৃতা প্রস্তুতকরণ এবং বিরোধীদের নতুন নির্বাচনের দাবি মোকাবেলা।
তবে টেরেসা মের সম্ভাব্য সংখ্যালঘু সরকারের জন্য এ মাসেই পার্লামেন্টে প্রথম ও বড় পরীক্ষা আসছে। আগামী ১৯ জুন রানির বক্তৃতার মাধ্যমে পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হবে। রানির বক্তৃতায় নতুন সরকারের আইন প্রণয়ন কর্মসূচি, নির্বাচনী ইশতেহার গুরুত্ব পেয়ে থাকে। এসব কর্মসূচি নিয়ে পার্লামেন্ট সদস্যরা ছয় দিন ধরে বিতর্কের পর ২৭ জুন ভোট দেবেন। আর এ ভোটই হবে টেরেসা মের সরকার ও ডিইউপির সঙ্গে সমঝোতার প্রথম পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় সফল হতে হলে টেরেসা মেকে ডিইউপির সমর্থন পেতেই হবে। কারণ ৬৫০ আসনের হাউস অব কমনসে টোরিদের আসন ৩১৮টি। সরকার গঠনসহ পার্লামেন্টে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ডিইউপির ১০ জন এমপির ভোটের দিকে টেরেসা মেকে তাকিয়ে থাকতে হবে। তাঁদের বিরুদ্ধে থাকবেন লেবার দলীয় ২৬২, স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির ৩৫, লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলীয় ১২ এবং অন্যান্য দলের ১৩ জন এমপি। অর্থাৎ টোরি-ডিইউপি সরকারের ৩২৮ জন এমপির বিরুদ্ধে থাকবেন ৩২২ জন এমপি। শুরু থেকেই সরকারকে আস্থার পরীক্ষায় রাখতে চান লেবাররা।
বিরোধী রাজনীতিকরা এরই মধ্যে দাবি তুলেছেন, টোরি-ডিইউপি সমঝোতার বিষয়বস্তু প্রকাশ করতে হবে। টোরিদের সঙ্গে ডিইউপির নির্বাচনী ইশতেহার এবং বিভিন্ন ইস্যুতে যথেষ্ট অবস্থানগত পার্থক্য আছে। এর পরও টেরেসা মে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে ডিইউপির সঙ্গে আপস করছেন কি না, তা নিয়েও আছে নানা শঙ্কা। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্যার মাইকেল ফ্যালন বলেছেন, ডিইউপির সঙ্গে কনজারভেটিভদের সমঝোতা হবে মূলত অর্থনীতি ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়ে। ডিইউপির সব মতাদর্শের বিষয়ে টোরিরা একমত হবে না। তিনি আরো বলেন, টোরি-ডিইউপি আনুষ্ঠানিক কোনো জোট হবে না। কেবল সংখ্যালঘু সরকার গঠন ও টিকিয়ে রাখতে সমর্থন দেওয়ার ব্যাপারে সমঝোতা হবে।
টোরি-ডিইউপি সমঝোতা ঠেকাতে এক অনলাইন পিটিশনে গতকাল রবিবার সকাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় লাখ স্বাক্ষর জমা পড়েছে। লেবার দলীয় নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডবিষয়ক সাবেক মন্ত্রী লর্ড মারফি সতর্ক করে বলেছেন, টেরেসা মে নিজেকে বাঁচাতে ডিইউপির সঙ্গে সমঝোতা করে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে শান্তিপ্রক্রিয়াকেই ঝুঁকিতে ফেলছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের চুক্তি কয়েক দশক ধরে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে শান্তি ও স্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টাকে ব্যাহত করবে।
তবে এসব সমালোচনা ও সতর্কবার্তা সত্ত্বেও ব্রেক্সিটকে সামনে রেখে যুক্তরাজ্যে স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টায় টেরেসা মে ডিইউপিকে নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
from যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ – দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ http://ift.tt/2siC3dT
June 12, 2017 at 10:16AM
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন