‘বিদায় দাও গো বন্ধু তোমরা, এবার দাও বিদায়’-কণ্ঠসৈনিক আবদুল জব্বার আর নেই

সুরমা টাইমস ডেস্ক:: সালাম সালাম হাজার সালাম, জয় বাংলা বাংলার জয়, ওরে নীল দরিয়া, তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়-এর মত অসংখ্য উজ্জয়নী আর আবেগসান্দ্র গানের শিল্পী স্বাধীনতাযুদ্ধের কণ্ঠসৈনিক আবদুল জব্বার আর নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার সকাল ৯টা ১০ মিনিটে মারা যান তার বাবা। তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।

পাঁচ দশকের বেশি সময় বাংলাদেশের গানের ভূবনে আলো ছড়ানো দরাজ কণ্ঠের এই শিল্পীর দুটো কিডনিই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পাশাপাশি তিনি হৃদযন্ত্র ও প্রোস্টেটের সমস্যায় ভুগছিলেন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

চলতি বছর মে মাসে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হলে প্রথমে আইসিইউ ও পরে কেবিন ব্লকে স্থানান্তর করা হয়।

অবস্থার অবনতির খবর পেয়ে গত কয়েক দিন ধরেই শিল্পীর আত্মীয়-স্বজন ও সহকর্মীরা হাসপাতালে ভিড় করছিলেন।বুধবার তার মৃত্যুর খবর এলে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। আরও অনেকের সঙ্গে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও হাসপাতালে ছুটে যান।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই শিল্পী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদক ছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, “আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আবদুল জব্বাবের গান মুক্তিযোদ্ধা ও দেশের তরুণ সমাজকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতায় তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই শিল্পীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।

আবদুল জব্বারের বড় ছেলে মিথুন জব্বার বলেন, “বাবা আসলে অনেক বড় ফাইটার ছিলেন। তিনি বীরের মত লড়াই করতে করতে চলে গেছেন। কাল রাতে যখন শেষ কথা হল, আমি বলেছিলাম- বাবা, তুমি ভেঙে পড়ো না। বাবা বলেছিলেন, ‘আমি এত তাড়াতাড়ি মরব না ব্যাটা’। আমি তাকে অনেকক্ষণ গান শুনিয়েছিলাম রাতে।”

তথ্যমন্ত্রী হাসনুল হক ইনু বলেন, “আবদুল জব্বারের মত জাতীয় ব্যক্তিত্ব আজ সমস্ত ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে চলে গেলেন। রাষ্ট্র ও সরকারের আহ্বানে পাশে দাঁড়িয়ে তিনি আমৃত্যু জনগণের সেবা করে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে শিল্প-সাহিত্যের ধারাকে তিনি সমৃদ্ধ করে গেছেন।”

আবদুল জব্বারের গান সংকলিত করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী।

সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, “আবদুল জব্বার ছিলেন আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সৈনিক। যুদ্ধ এবং যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশের সংগীত জগতে তার অবদান অনেক। তার চলে যাওয়াটা আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।”

হাসপাতাল থেকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আবদুল জব্বারের মরদেহ মোহাম্মদপুরের মারকাজুল ইসলাম মসজিদে নেওয়া হয় গোসলের জন্য। এরপর কফিন নেওয়া হবে ভুতের গলিতে তার বাসায়। রাতে মরদেহ রাখা হবে বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে।

সংস্কৃতিমন্ত্রী নূর জানান, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় বাংলাদেশ বেতারে আবদুল জব্বারের জানাজা হবে। এরপর সবার শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বেলা ১১টায় কফিন নেওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।

জোহরের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে আবার জানাজা হবে। বিকালে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের কবরের জন্য নির্ধারিত স্থানে দাফন করা হবে একাত্তরের এই কণ্ঠযোদ্ধাকে।

১৯৩৮ সালের ৭ নভেম্বর কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল জব্বার। মায়ের প্রেরণায় ছোটবেলা থেকেই সংগীতের সঙ্গে গড়ে ওঠে তার সখ্যতা।

কুষ্টিয়ায় মহম্মদ ওসমানের কাছে যখন গান শিখতে শুরু করেন, জব্বার তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। পরে মকসেদ আলী সাঁই ও লুৎফেল হক ও কলকাতায় শিবুকুমার চ্যাটার্জীর কাছেও তালিম নেন।

১৯৫৭ সালে একটি বিচিত্রানুষ্ঠানে জব্বারের কণ্ঠে নজরুলের গান ‘ঘুমিয়ে আছো বুলবুলি গো মদিনার গুলবাগে’ শুনে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন গীতিকার আজিজুর রহমান। পরের বছর নিয়মিত শিল্পী হিসেবে বেতারে গাইতে শুরু করেন আবদুল জব্বার। সেখানেই নজরে পড়েন সংগীত পরিচালক রবীন ঘোষের।

১৯৬২ সালে রবীন ঘোষের সংগীত পরিচালনায় নির্মাতা এহতেশামের সিনেমা ‘নতুন সুর’ দিয়ে আবদুল জব্বারের চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের সূচনা। দুই বছর পরে বিটিভিতেও নিয়মিত শুরু করেন তিনি।

স্বাধীনতার আগে জহির রায়হানের ‘সঙ্গম’, ‘জীবন থেকে নেওয়া’, সুভাষ দত্তের ‘আলিঙ্গন’, নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘দীপ নেভে নাই’, ‘ঢেউয়ের পরে ঢেউ’, ‘বিনিময়’, ‘নাচের পুতুল’, ‘ছদ্মবেশী’, ‘সিরাজুদ্দৌলা’, ‘আপনপর’, ‘এতটুকু আশা’র মতো সিনেমায় গান গেয়ে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

এর মধ্যে ‘এতটুকু আশা’ সিনেমায় আবদুল জব্বারের কণ্ঠের ‘তুমি কি দেখেছো কভু’; পীচ ঢালা পথ সিনেমার ‘পীচঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি’; ঢেউয়ের পরে ঢেউ সিনেমায় ‘সুচরিতা যেওনাকো’ গানগুলো মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে দীর্ঘদিন।

ষাটের দশকের শেষ দিকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা গ্রেপ্তার হওয়ার সময় থেকে প্রতিবাদী গণসংগীতে কণ্ঠ দিতে শুরু করেন আব্দুল জব্বার। ‘তুমি কি দেখেছো বন্ধু আইয়ুবের পরাজয়’, ‘শহরবাসী শোন’, ‘তোমরা যাদের মানুষ বলনা’র মতো গানগুলো গাইতে গাইতেই স্বাধীনতার আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।

১৯৬৯ সালে ‘বিমূর্ত’ নামের একটি সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন আবদুল জব্বার; গঠন করেন ‘বঙ্গবন্ধু শিল্পীগোষ্ঠী’, যার সভানেত্রী ছিলেন বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজীব।

একাত্তরের ২৫ মার্চের পর স্ত্রীকে নিয়ে আগরতলায় চলে যান আব্দুল জব্বার, সেখানে দেখা হয় আপেল মাহমুদের সঙ্গে। পরে তারা মুজীবনগরে পৌঁছে যোগ দেন স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রে।

মুক্তিযুদ্ধের নয়টি মাস ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘অনেক রক্ত দিয়েছি মোরা’, ‘আমি এক বাংলার মুক্তিসেনা’, ‘বাংলার স্বাধীনতা আনলো কে- মুজিব মুজিব’ গানগুলো স্বাধীনতাকামী বাঙালিকে নতুন সূর্যের জন্য অপেক্ষার প্রেরণা যুগিয়ে গেছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে ‘মানুষের মন’, ‘স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা’, ‘ঝড়ের পাখি’, ‘আলোর মিছিল’, ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘তুফান’, ‘অঙ্গার’, ‘সারেং বৌ’, ‘সখি তুমি কার’, ‘কলমিলতা’ সিনেমায় আবদুল জব্বারের গাওয়া গানগুলো জনপ্রিয়তা পায়। এর মধ্যে ১৯৭৮ সালের ‘সারেং বৌ’ সিনেমার ‘ও রে নীল দরিয়া’ গানটি তাকে খ্যাতির চূড়ায় নিয়ে যায়।

আবদুল জব্বারের প্রথম মৌলিক গানের অ্যালবাম ‘কোথায় আমার নীল দরিয়া’ প্রকাশিত হয় জীবনের একেবারে শেষবেলায় এসে, চলতি বছর।যদিও এর কাজ তিনি শুরু করেছিলেন ২০০৮ সালে।

সংগীতে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৮০ সালে আবদুল জব্বারকে একুশে পদক এবং ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। ২০০৬ সালে বিবিসি বাংলার শ্রোতা জরিপে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় আসে তার গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ ও ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গান তিনটি।

আবদুল জব্বারের প্রথম স্ত্রী শাহীন জব্বার শাহীন একজন গীতিকার, দ্বিতীয় স্ত্রী রোকেয়া জব্বার মিতা, তৃতীয় স্ত্রী হালিমা জব্বার। দুই ছেলে দুই মেয়ে রেখে গেছেন তিনি।

এই শিল্পীর হৃদয়ছোঁয়া বহু গানের মধ্যে একটি গান তার মৃত্যুর সময় ফিরে ফিরে আসছে ভক্ত-শ্রোতাদের মনে। সত্তরের দশকে ‘মা’ অ্যালবামের সেই গান সিনেমাতেও ব্যবহার করা হয়েছিল।

‘বিদায় দাও গো বন্ধু তোমরা, এবার দাও বিদায়’ শিরোনামের ওই গানে আবদুল জব্বার গেয়েছিলেন- এই বুঝেছি সার, মিছে এ সংসার/ হেথা আপন বলে মানতে পারি, এমন কেহ নাই রে…, এমন কেহ নাই….।”



from Sylhet News | সুরমা টাইমস http://ift.tt/2wiWvvQ

August 30, 2017 at 11:12PM
30 Aug 2017

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

:) :)) ;(( :-) =)) ;( ;-( :d :-d @-) :p :o :>) (o) [-( :-? (p) :-s (m) 8-) :-t :-b b-( :-# =p~ $-) (b) (f) x-) (k) (h) (c) cheer
Click to see the code!
To insert emoticon you must added at least one space before the code.

 
Top